ঘনীভূত রাজনৈতিক সঙ্কটের অবসান আগামী মাসেই সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরকারের বৈঠক * বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে যেতে পারেন প্রধান উপদেষ্টা শিগগিরই নির্বাচনের রোডম্যাপ
ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করা আরেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের পদত্যাগ চেয়ে রাজপথে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে ছাত্রদের রাজনৈতিক দল এনসিপি বিএনপির এই অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে। তারা পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে নির্বাচন কমিশনে বিক্ষোভ করে কমিশন সদস্যদের পদত্যাগ দাবি করে। সেই সাথে বিএনপি সমর্থিত তিন উপদেষ্টারও পদত্যাগ চায় তারা। এই নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে পাল্টাপাল্টি রাজনীতি চলে। এই পরিস্থিতিতে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার জন্য একটি শ্রেণি ওঁৎপেতে থাকে। তারা এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মাঠ আরো উত্তপ্ত করে তোলে এবং পাশাপাশি নানান গুজব ও গুঞ্জন ছড়াতে থাকে। এর মধ্যে যারা নির্বাচন চায় না তারই প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগের বিষয়টি অত্যন্ত সুকৌশলে প্রচার করতে থাকে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী যখন তার স্ট্যাটাসের মাধ্যমে জানিয়ে দেনÑ প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করছেন না, তখন এই চক্রান্তকারীরা জাতীয় সরকারের সেই পুরোনো ফর্মুলাকে আবার সামনে নিয়ে আসে। তবে ভারতীয় এ দেশীয় এসব এজেন্টদের এমন কৌশল এখন আর কাজ করবে না। প্রধান উপদেষ্টা নিজেই এখন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর এই ঘোষণা সম্ভবত আগামী ঈদের পরপরই আসতে পারে। সরকারের উপদেষ্টাদের বক্তব্য থেকেও এটি এখন স্পষ্ট। যে সব উপদেষ্টা নির্বাচনের বিরুদ্ধে ছিলেন। যারা অন্তত তিন বছর ক্ষমতায় থাকার পক্ষে ছিলেন তারাই এখন বলছেন নির্বাচনের কথা। গতকাল এক উপদেষ্টা বলেছেন, আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। আমরা সে পথেই অগ্রসর হচ্ছি। নির্বাচন আগামী ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যেই হবে। এর কোনো পরিবর্তন হবে না।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী ইনকিলাবকে বলন, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগ করলেই সব সঙ্কটের সমাধান হয়ে যাবেÑ এটি মনে করার কারণ নেই; বরং সঙ্কট আরো তীব্র হবে। তাই তাকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তার প্রতি দেশবাসীর অনেক আশা-আকাক্সক্ষা রয়েছে। তিনি একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে দায়িত্ব দিয়ে যাবেনÑ এটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা। আমি মনে করি, তিনি তাই করবেন।’ বর্তমান সঙ্কট উত্তোরণে বেগম খালেদা জিয়া কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন কি-না, জানতে চাইলে দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এখন গোটা দেশবাসীর আশা-ভরসার প্রতীক। তিনি লন্ডন থেকে চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে এখন সম্পূর্ণ বিশ্রামে আছেন। এই মুহূর্তে প্রধান উপদেষ্টা যদি তার বাসায় দেখা করতে যান তাহলে সেটি হবে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের বহিঃপ্রকাশ। পাশাপাশি তিনি তার সাথে একান্তে আলোচনা করে বর্তমান সঙ্কটের একটি উত্তম সমাধানও পেতে পারেন বলে আমি মনে করি।’
কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে দেয়া এক পোস্টে বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করে ‘ভুল করেছেন’। পদত্যাগ করা হবে ড. ইউনূসের ব্যর্থতা, তার জন্য আত্মঘাতী। কোনো ব্যক্তি বা দল নয়, তার উচিত জনগণের ঐতিহাসিক অভিপ্রায়কে সম্মান করা, কোনো দল বা গোষ্ঠীর চাপে বিভ্রান্ত না হয়ে জনগণের ওপর আস্থা রাখা।
শুধু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাই নন, রাজনৈতিক দলগুলো প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করুকÑ এমনটি চায় না। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, পদত্যাগ কোনো সমাধান নয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে যত দ্রুত নির্বাচন ও নির্বাচিত সরকার হবে ততই অস্থিরতা কমে আসবে। বর্তমানে দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। সরকার নির্বাচনের পথে যত দ্রুত হাঁটবে তত তাড়াতাড়ি অস্থিরতা মুক্ত হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আমরা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পদত্যাগ চাই না। আমরা আশা করব, তিনি একজন বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব, তিনি বিষয়টি অনুধাবন করবেন। অতি শিগগিরই জাতির আকাক্সক্ষা অনুযায়ী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি রোডম্যাপ তিনি স্পেসিফিক ঘোষণা করবেন।
অন্যদিকে এবি পার্টি গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, রাষ্ট্রের সম্ভাব্য রাজনৈতিক সঙ্কট ও জটিল পরিস্থিতিতে ড. ইউনূসের পদত্যাগ নয়; বরং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব পক্ষকে সমঝোতামূলক সমাধানে পৌঁছাতে হবে।

Comments
Post a Comment